Breaking News
লোড হচ্ছে...

Advertisement

ব্রেকিং নিউজ
সর্বশেষ সংবাদ লোড হচ্ছে...
লোডিং...

তক্ষক এত দামি প্রাণি কেন?

 

তক্ষক কেন এতো দামী? জেনে নিন বহুমূল্য এই প্রাণীর নেপথ্যের রহস্য ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি তক্ষক (Gekko gecko), যা স্থানীয়ভাবে ‘তক্ষক’ নামেই পরিচিত। এটি মূলত লিজার্ড বা টিকটিকি প্রজাতির একটি সরীসৃপ হলেও এর ডাক এবং বিশালাকৃতির কারণে এটি সবার নজরে পড়ে। গত কয়েক দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই প্রাণীটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিশাল কালোবাজারি সিন্ডিকেট। অনেক সময় শোনা যায়, একটি তক্ষকের দাম কোটি টাকা পর্যন্ত হাঁকা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামান্য একটি সরীসৃপের দাম কেন এতো বেশি? কেনই বা এটি পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে?

১. ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় ব্যবহার ও মিথ

তক্ষকের আকাশচুম্বী দামের প্রধান কারণ হলো চীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি। এসব দেশে প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বাস করা হয় যে, তক্ষকের শরীরের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে এর রক্ত এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জটিল রোগ সারাতে সক্ষম।

  • যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি: অনেক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় যে, তক্ষক দিয়ে তৈরি ওষুধ যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাদুর মতো কাজ করে।

  • অসাধ্য রোগ নিরাময়: এক সময় গুজব ছড়িয়েছিল যে, তক্ষক দিয়ে এইচআইভি (HIV) বা ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি সম্ভব। যদিও আধুনিক বিজ্ঞানে এর কোনো ভিত্তি নেই, তবুও এই মিথ বা অন্ধবিশ্বাসের কারণে এর চাহিদা কমেনি।

২. আন্তর্জাতিক কালোবাজার ও চোরাচালান

তক্ষক এখন বিশ্বের অন্যতম পাচার হওয়া বন্যপ্রাণী। যেহেতু বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী এটি ধরা বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ, তাই এর লেনদেন হয় সম্পূর্ণ গোপনে বা ‘ব্ল্যাক মার্কেটে’। যখন কোনো জিনিসের জোগান কম থাকে কিন্তু চাহিদা বেশি থাকে, তখন তার দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অল্প দামে তক্ষক সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে।

৩. অলৌকিক বিশ্বাস ও সৌভাগ্যের প্রতীক

কিছু কিছু সংস্কৃতিতে তক্ষককে কেবল প্রাণী হিসেবে নয়, বরং অলৌকিক শক্তির অধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক দেশে বিশ্বাস করা হয় যে, বাড়িতে তক্ষক থাকা সৌভাগ্যের প্রতীক এবং এটি ধন-সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই ধরণের ভিত্তিহীন বিশ্বাসও এই প্রাণীটির বাণিজ্যিক মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

৪. প্রজনন হার ও সংগ্রহে প্রতিকূলতা

তক্ষক একটি বন্য প্রাণী এবং এরা প্রজনন করতে বেশ দীর্ঘ সময় নেয়। এছাড়া এরা খুব সহজে মানুষের সংস্পর্শে আসতে চায় না। দিন দিন বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাওয়ায় তক্ষকের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে, ফলে এরা বিরল হয়ে উঠছে। এই বিরলতাই সংগ্রাহকদের কাছে এর অর্থনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে অনেকে শখের বশে বা স্রেফ ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে তক্ষক সংগ্রহ করে রাখছেন।

পরিবেশের ওপর প্রভাব ও আইনি সতর্কতা

তক্ষক প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাণী। এরা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু অতিরিক্ত শিকার এবং পাচারের ফলে এই প্রজাতিটি আজ বিপন্ন হওয়ার পথে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, তক্ষক ধরা, কেনা-বেচা বা পাচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সরকার এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

উপসংহার: তক্ষকের আকাশচুম্বী দামের বিষয়টি মূলত একটি বড় ধরণের ‘ভুল বিশ্বাস’ এবং ‘গুজব’-এর ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত তক্ষকের কোনো ঔষধি গুণের প্রমাণ পায়নি। সুতরাং, লোভে পড়ে এই নিরীহ প্রাণীটিকে শিকার করা বা পাচারের সাথে জড়িত হওয়া কেবল আইনের দৃষ্টিতেই অপরাধ নয়, বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধেও একটি বড় অন্যায়। আমাদের উচিত এই গুজব প্রতিরোধ করা এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতন হওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ