সাপের কামড় খেয়ে ৩টি জীবন্ত গোখরো নিয়ে হাসপাতালে যুবক! বিহারের রোহতাসে হুলস্থুল
বিচিত্র এই পৃথিবীতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা কল্পনাকেও হার মানায়। সম্প্রতি ভারতের বিহার রাজ্যের রোহতাস জেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন বিস্ময় জাগিয়েছে, তেমনি আতঙ্ক ছড়িয়েছে খোদ হাসপাতালেও। সাপের কামড়ের চিকিৎসা নিতে আসা এক যুবক তার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন একটি নয়, দুটি নয়, বরং তিনটি বিশাল আকৃতির বিষধর জীবন্ত গোখরো সাপ! এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে রোগী ও সাধারণ মানুষের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: দক্ষ সাপুড়ের অসাবধানতা
ঘটনাটি বিহারের সাসারাম সদর হাসপাতালের। আক্রান্ত যুবকের নাম গৌতম কুমার, যিনি রাজপুর থানা এলাকার বাসিন্দা। গৌতম এলাকায় একজন দক্ষ সাপ শিকারি হিসেবে পরিচিত। গ্রাম বা আশেপাশে সাপ ঢুকে পড়লে গ্রামবাসী তাকেই খবর দেন এবং তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সাপগুলো ধরে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করেন।
কয়েকদিন আগেই গৌতম তিনটি বড় আকৃতির 'ইন্ডিয়ান কোবরা' বা গোখরো সাপ ধরেছিলেন। সাপগুলোকে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তিনি জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন তিনি কৌতুহলবশত বস্তার মুখ খুলে সাপগুলো দেখার চেষ্টা করেন। আচমকাই একটি বিষধর কোবরা ফণা তুলে তার হাতে কামড় বসিয়ে দেয়।
হাসপাতালে ৩টি কোবরা নিয়ে প্রবেশ ও আতঙ্ক
বিষধর সাপের কামড় খাওয়ার পর গৌতম বুঝতে পারেন যে হাতে সময় খুব কম। কোনো ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট না করে তিনি দ্রুত সাসারাম সদর হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের দিকে রওনা হন। তবে তিনি একা যাননি; যে তিনটি সাপ তিনি ধরেছিলেন, সেই বস্তাটিও সঙ্গে নিয়ে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল চিকিৎসকদের দেখানো যে কোন প্রজাতির সাপ তাকে কামড় দিয়েছে, যাতে সঠিক বিষ প্রতিষেধক (Anti-venom) প্রয়োগ করা সহজ হয়।
হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে পৌঁছে যখন তিনি বস্তাটি মেঝেতে রাখেন এবং মুখ খোলেন, তখন সেখানে উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে যায়। বস্তা থেকে বেরিয়ে আসে ৮ থেকে ১০ ফুট লম্বা তিনটি অত্যন্ত বিষধর গোখরো। সাপের হিসহিস শব্দ আর ফণা তোলা দেখে হাসপাতালের নার্স, ওয়ার্ড বয় এবং অন্য রোগীদের স্বজনদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত থমকে দাঁড়ায়।
চিকিৎসা ও বন দপ্তরের পদক্ষেপ
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং গৌতমকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রদান শুরু করে। চিকিৎসকরা জানান, সঠিক প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার কারণে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে গৌতম কুমারের অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
এদিকে হাসপাতালের ভেতর তিনটি জীবন্ত সাপের উপস্থিতির খবর পেয়ে বন দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। পরে বন বিভাগের কর্মীরা এসে বিশেষ সতর্কতার সাথে সাপ তিনটি উদ্ধার করে নিয়ে যান। বন বিভাগ সূত্রে জানানো হয়েছে, সাপগুলোকে উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে পুনরায় গভীর জঙ্গলে অবমুক্ত করা হবে।
জনমনে চাঞ্চল্য ও শিক্ষণীয় দিক
এই ঘটনাটি রোহতাস জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গৌতমের সাহসিকতা নাকি বোকামি—তা নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপে কামড়ালে সাপটি সাথে করে হাসপাতালে নেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, অনেক সময় তা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। কারণ সাপের প্রজাতি জানা থাকলে চিকিৎসকদের পক্ষে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া অনেক সহজ হয়। তবে জীবন্ত সাপের বদলে ছবি তোলা বা মৃত সাপ নেওয়াটা নিরাপদ বলে মনে করেন অনেকে।
শেষ কথা: সাসারাম সদর হাসপাতালের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করার সময় সামান্যতম অসাবধানতাও প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেই আজ গৌতম কুমার প্রাণে বেঁচে গেছেন। বিচিত্র এই ঘটনাটি সাসারামবাসীর স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

0 মন্তব্যসমূহ