জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড: বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে ক্যু, পাল্টা-ক্যু আর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশটির শাসনব্যবস্থায় এক বিশাল অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। তিনি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। তবে তার এই উত্থান এবং দীর্ঘ শাসনকাল যেমন আলোচিত, তার মর্মান্তিক মৃত্যুও তেমনই রহস্যে ঘেরা।
ক্ষমতার পটভূমি ও জিয়াউর রহমানের শাসনকাল
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কয়েক দফা সামরিক অভ্যুত্থান ও অস্থিতিশীলতার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা সুসংহত করেন। তার শাসনামলে তিনি 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর আদর্শ প্রচার করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল। সামরিক বাহিনী থেকে এসে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ায় তার শাসনামলে সেনাবাহিনীর প্রভাব ছিল প্রবল। তিনি একইসঙ্গে সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে অনেক সিনিয়র অফিসারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এছাড়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের বদলে পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে।
১৯৮১ সালের সেই অভিশপ্ত মে মাস
১৯৮১ সালের মে মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত ছিল। সেই সময় একটি রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে এবং স্থানীয় দলীয় কোন্দল নিরসনে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ মে ভোরের আলো ফোটার আগেই চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা সদস্য অতর্কিত হামলা চালায়। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেই ঘাতক দলের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনাটি 'চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান' হিসেবে পরিচিতি পায়। যদিও সরকারি নথিতে এটি একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত, কিন্তু এটি সফলভাবে দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের জীবন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মূল কারণসমূহ
জিয়াউর রহমানের হত্যার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো একটি কারণকে দায়ী করা কঠিন। ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু জটিল বিষয়ের সমষ্টি ছিল এই হত্যাকাণ্ড:
১. সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল: জিয়ার শাসনামলে সেনাবাহিনীতে প্রায় ২০টিরও বেশি ছোট-বড় অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিটি ঘটনার পর অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে কঠোর দণ্ড বা ফাঁসি দেওয়া হয়। এই কঠোরতা সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে তীব্র প্রতিহিংসার জন্ম দিয়েছিল।
২. ক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা: চট্টগ্রামের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সাথে জিয়াউর রহমানের পেশাগত ও ব্যক্তিগত বিরোধ চরমে উঠেছিল। ধারণা করা হয়, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
৩. রাজনৈতিক আদর্শিক সংঘাত: সামরিক শাসনের মোড়কে রাজনীতি পরিচালনা এবং অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকে পুনর্বাসিত করার সিদ্ধান্ত অনেক রাজনৈতিক মহল ও সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
অমিমাংসিত রহস্য ও ফলাফল
জিয়াউর রহমান হত্যার পরপরই জেনারেল মঞ্জুর নিহত হন এবং পরে অনেক সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কারা ছিল বা এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা আজও অমীমাংসিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ঘটনাটি এক দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন তৈরি করেছে, যা আজও বিদ্যমান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যু কেবল একটি দলের নেতার বিদায় ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর এক বড় আঘাত।
0 মন্তব্যসমূহ