ইসরায়েল কেন এতো শক্তিশালী? গবেষণায় বিনিয়োগ নাকি অন্য কিছু?
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে ইসরায়েল একটি অত্যন্ত আলোচিত এবং প্রভাবশালী নাম। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও সামরিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশটি যে পরিমাণ ক্ষমতা প্রদর্শন করে, তা অনেক বড় রাষ্ট্রের জন্যও ঈর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চারদিকে শত্রুবেষ্টিত হওয়ার পরও ইসরায়েল কেন এতোটা শক্তিশালী? এর নেপথ্যে কি কেবল উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো কারণ?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই অতি-শক্তির মূলে রয়েছে তাদের সুদূরপ্রসারী শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ।
১. গবেষণায় বিশ্বসেরা বিনিয়োগ
ইসরায়েলের শক্তিশালী হওয়ার প্রধান স্তম্ভ হলো ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (R&D) বা গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে তাদের অভাবনীয় বিনিয়োগ। দেশটি তার মোট জিডিপির (GDP) প্রায় ৬ শতাংশ গবেষণায় খরচ করে, যা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। এর ফলে দেশটির শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু উদ্ভাবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ইসরায়েল আজ কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, বরং বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি রপ্তানিকারক বা ‘জ্ঞান তৈরির কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় কর্পোরেট হাউজ এবং টেক জায়ান্টগুলোর বড় একটি অংশই ইসরায়েলে তাদের গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেছে।
২. ব্যবসা ও জাতির একতা
ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদিরা ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত দক্ষ। তাদের একটি বিশেষ নীতি হলো—এক ইহুদি অন্য ইহুদিকে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করে। এই পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থের এই প্রাচুর্য তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৩. মুক্তচিন্তা ও বাক-স্বাধীনতা
জ্ঞানের বিকাশের জন্য একটি মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রচুর দ্বন্দ্ব থাকলেও, সেখানে বাক-স্বাধীনতা বিদ্যমান। দেশটির নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোদ সরকারের ‘ফিলিস্তিন নীতি’র কঠোর সমালোচনা করা হয়। নোয়া হারারি বা গেডিয়ন লেভির মতো বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদরা নিয়মিত সরকারের সমালোচনা করলেও তাদের গ্রেফতার বা দমন করা হয় না। এই মুক্ত পরিবেশই তাদের মেধাবীদের নতুন নতুন দর্শন ও প্রযুক্তি তৈরিতে উৎসাহিত করে।
৪. মুসলিম বিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
ইসরায়েলের শক্তির বিপরীতে যদি মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকানো যায়, তবে এক বিশাল ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। তুরস্ক গবেষণা খাতে জিডিপির ১.১৩ শতাংশ এবং ইরান ০.৮ শতাংশ খরচ করলেও, অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও হতাশাজনক। আমাদের দেশ গবেষণা খাতে জিডিপির মাত্র ০.০৩ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। এই সামান্য অর্থের সিংহভাগই আবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় গবেষকদের হাতে পৌঁছায় না। ফলে আমাদের দেশে মেধা থাকলেও উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটছে না। এই কারণেই আজ পদ্মা সেতু তৈরিতে চীনা প্রকৌশলী, মেট্রোরেলে জাপানি এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
৫. শিক্ষার লক্ষ্য ও ভ্রান্ত ধারণা
আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা যেখানে বুয়েটে বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ে, সেখানে তাদের লক্ষ্য থাকে বিসিএস বা সরকারি চাকরির জন্য সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করা। মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চার চেয়ে চাকরির বাজার দখলের লড়াই তাদের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আবার একটি বড় অংশ আধুনিক বিজ্ঞানের পরিবর্তে ভ্রান্ত তত্ত্ব বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েলের শক্তিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। অনেকে মনে করেন ইসরায়েলের শক্তির পেছনে অলৌকিক কোনো অশুভ শক্তি বা ‘দাজ্জাল’ কাজ করছে, যা তাদের প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
উপসংহার: ইসরায়েল শক্তিশালী হওয়ার পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নেই; বরং রয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সঠিক শিক্ষা পরিকল্পনার প্রয়োগ। মুসলিম দেশগুলো যদি তাদের গঠনগত সমস্যা কাটিয়ে উঠে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং একটি মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবেই তারা বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

0 মন্তব্যসমূহ