ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনা কেন?
ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের একপাক্ষিক বিবৃতি: জনমনে কেন এতো ক্ষোভ ও সমালোচনা?
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পটপরিবর্তনে উত্তাল বিশ্ব। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিহতের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শোক ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালালে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। তবে এমন এক সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া একটি বিবৃতি নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ইরানের ক্ষয়ক্ষতি
বিগত ২৪ ঘণ্টায় তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলায় অন্তত ৫৭ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছাড়াও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও শোক প্রকাশ করেছেন। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালায়।
বাংলাদেশের আলোচিত সেই বিবৃতি
রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলার বিষয়ে নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত’ হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো বিবৃতিতে কোথাও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি ইরানে হওয়া ভয়াবহ হামলা বা সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও কোনো নিন্দা বা শোকবাণী দেওয়া হয়নি।
সমালোচনার মূল কারণসমূহ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই অবস্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমালোচনার প্রধান কারণগুলো হলো:
১. একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি: নেটিজেনদের মতে, বাংলাদেশ সরকার কেবল ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়েছে, কিন্তু হামলার মূল উসকানিদাতা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংসতা নিয়ে নীরব থেকেছে। একে ‘একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট’ কূটনীতি হিসেবে দেখছেন অনেকে।
২. ইসরায়েলের নাম এড়িয়ে যাওয়া: ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশ সবসময়ই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। কিন্তু ইরানের মতো একটি বন্ধুপ্রতীম মুসলিম দেশের ওপর ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে কেন কোনো উচ্চবাচ্য করা হলো না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
৩. সার্বভৌমত্ব নিয়ে বৈষম্য: বিবৃতিতে কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কথা বলা হলেও ইরানের সার্বভৌমত্ব যে ইসরায়েলি হামলায় ধুলিসাৎ হলো, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নীরবতা কূটনৈতিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
৪. সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ: ফেসবুক ও টুইটারে (এক্স) সাধারণ ব্যবহারকারীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের পদত্যাগ এবং পররাষ্ট্র নীতির কঠোর সমালোচনা করছেন। অনেকেই বলছেন, এই বিবৃতি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং এটি কোনো পরাশক্তির চাপে দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সরকারের নীরবতা
এই সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে এই বিবৃতির কোনো সংশোধনী বা অতিরিক্ত ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত না আসায় বিতর্কটি আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
শেষ কথা: পররাষ্ট্র নীতি সাধারণত একটি দেশের জাতীয় স্বার্থ ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল ইস্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ ও প্রত্যাশার বিপরীতে বলে মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং ইনসাফপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ উজ্জ্বল করতে পারত।

0 মন্তব্যসমূহ